কেউ মারা যাবার পর তার সন্তানদের বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করা লাগে। এর কিছু হচ্ছে দুনিয়াবি আর কিছু আখেরাত সংশ্লিষ্ট। মূলত দুনিয়াবি ব্যাপারগুলোও আখিরাতের জন্যই প্রয়োজন।
.
.
দুনিয়াবি বিষয়গুলো হচ্ছে-.
.
১) মৃতের ঋণ শোধ করা। কেননা ঋণ একটা বড় বোঝা। এমনকি শহিদের রুহও ঋণের কারণে আটকে যায়।
২) মৃতের কোনো ওয়াসিয়াত থাকলে তা পূরণ করা।
৩) জানাযা ও অন্যান্য ইন্তিজাম সঠিকভাবে করা।
৪) সম্পত্তি দ্রুততার সাথে সঠিকভাবে বন্টন করা।.
.
.
আখিরাত সংশ্লিষ্ট বিষয়:
.
এর মূল কথা হচ্ছে মৃত ব্যক্তির রুহে সাওয়াব পৌঁছানো,যাকে ইসালে সাওয়াব বলা হয়। হাদিসে আছে-.
.
إِذَا مَاتَ الإنْسَانُ انْقَطَعَ عنه عَمَلُهُ إِلا مِنْ ثَلاثةٍ إلا من صَدَقَة جَارِيَة أوَعِلْم يُنْتَفَعُ بِهِ أوَوَلَد صَالِح يَدْعُو لَهُ.
.
"যখন মানুষ মারা যায় তখন তিনটি আমল ব্যতীত অন্য সকল আমল তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম আর সেই নেককার সন্তান যে তার জন্য দু'আ করবে"[১].
.
কাজেই নেক সন্তানের দু'আ তার মৃত পিতামাতার রুহে পৌঁছে যায় এবং তারা উপকৃত হন।
এছাড়া আরও বিভিন্ন হাদিস হতে বোঝা যায় মূলত নেক আমল করে তার সাওয়াব মৃতের রূহে পৌঁছানো যায় এবং মৃত ব্যক্তি তা থেকে উপকৃত হন। এমন কিছু হাদিস নিম্নরূপ:.
.
.
১) إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُولُ أَنَّى هَذَا فَيُقَالُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ.
.
"ব্যক্তির মাকাম জান্নাতে উঁচু হয়, সে তখন বলে এটা কী? তাকে বলা হয়, তোমার জন্য তোমার সন্তানের করা ইস্তিগফার"[২].
.
কাজেই সন্তানের ইস্তিগফার মৃতের কাছে পৌঁছে এবং সে উপকৃত হয়,তার সম্মান বৃদ্ধি পায়।.
.
.
২) أَنَّ رَجُلا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ أُمِّي افْتُلِتَتْ نَفْسُهَا ( أي ماتت ) وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ فَهَلْ لَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ : نَعَمْ.
.
"একজন লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, আমার মা মারা গেছেন,আমার ধারণা যদি তিনি কথা বলতে পারতেন তাহলে সাদকাহ করতেন, যদি আমি তার পক্ষে সাদকাহ করি তাহলে কি তিনি প্রতিদান পাবেন? রাসূলুল্লাহ বললেন,হ্যা"[৩]
.
কাজেই ব্যক্তি তার মৃত পিতামাতা বা অন্য কারও জন্য সাদকাহ করলে মৃত ব্যক্তি সেই সাদকাহর প্রতিদান লাভ করে।.
.
.
৩) أنَّ رَجُلًا قالَ للنبيِّ صَلّى اللَّهُ عليه وسلَّمَ: إنَّ أَبِي ماتَ وَتَرَكَ مالًا، وَلَمْ يُوصِ، فَهلْ يُكَفِّرُ عنْه أَنْ أَتَصَدَّقَ عنْه؟ قالَ: نَعَمْ.
.
"একজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলো, আমার বাবা মারা গেছেন এবং সম্পদ রেখে গেছেন। তিনি কোনো ওয়াসিয়াতও করেন নি। আমি যদি তার পক্ষে সাদকাহ করি তাহলে কি এটা তার (গুনাহর) কাফফারা হবে? রাসূলুল্লাহ বললেন,হ্যা"[৪].
.
.
এতে বোঝা যায় কেউ ওয়াসিয়াত করুক বা না করুক তার পক্ষে সাদকাহ করলে সে সাওয়াব পাবে এবং গুনাহ মোচন হবে।.
.
.
৪) وعَنْ سَعْدِ ابْنِ عُبَادَةَ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّي مَاتَتْ أَفَأَتَصَدَّقُ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ قُلْتُ فَأَيُّ الصَّدَقَةِ أَفْضَلُ قَالَ سَقْيُ الْمَاءِ.
.
"সাদ বিন উবাদাহ রা. বলেন, আমি বললাম,ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মা মারা গেছেন, আমি কি তার পক্ষ থেকে সাদকাহ করবো? তিনি বললেন,হ্যা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন সাদকাহ উত্তম? তিনি বললেন, পানি পান করানো"[৫].
.
কাজেই সাদকাহর মাঝে উত্তম সাদকাহ হল পানি পান করানো। ধরুন কাউকে আপনি পানি পান করতে দিলেন সাথে সাথে নিয়ত করবেন যে আল্লাহ এর সাওয়াব উমুককে পৌঁছে দাও।.
.
.
৫) روى عَبْد اللَّهِ بْن بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيهِ رَضِي اللَّه عَنْه قَالَ بَيْنَما أَنَا جَالِسٌ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ أَتَتْهُ امْرَأَةٌ فَقَالَتْ إِنِّي تَصَدَّقْتُ عَلَى أُمِّي بِجَارِيَةٍ وَإِنَّهَا مَاتَتْ قَالَ فَقَالَ وَجَبَ أَجْرُكِ وَرَدَّهَا عَلَيْكِ الْمِيرَاثُ قَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ كَانَ عَلَيْهَا صَوْمُ شَهْرٍ أَفَأَصُومُ عَنْهَا قَالَ صُومِي عَنْهَا قَالَتْ إِنَّهَا لَمْ تَحُجَّ قَطُّ أَفَأَحُجُّ عَنْهَا قَالَ حُجِّي عَنْهَا.
.
.
বুরাইদাহ রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে বসা ছিলাম তখন একজন নারী এলেন, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি আমার মায়ের জন্য একটি দাসী সদকা করেছিলাম। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। একথা শুনে তিনি বললেন, তুমি তো তোমার সওয়াব পেয়ে গিয়েছ। তবে উত্তরাধিকার তোমার নিকট তা ফিরিয়ে দিয়েছে। তখন ঐ মহিলা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! তার উপর এক মাসের সাওমের কাযা রয়েছে। আমি তার পক্ষ হতে ঐ সাওম আদায় করতে পারি কি? তিনি বললেন, তুমি তার পক্ষ হতে সাওম পালন কর। অতঃপর মহিলা বললেন, তিনি তো তখনও হাজ্জও আদায় করেননি আমি তার পক্ষ হতে হাজ্জ (হজ্জ) আদায় করতে পারি কি? তিনি বললেন, তুমি তার পক্ষ হতে হাজ্জ (হজ্জ) আদায় কর।"[৬].
.
.
কাজেই মৃতের কাযা সিয়াম ও হজ্ব যেমন আদায় করা যায় তেমনি হজ্ব বা অন্য আমল তার পক্ষ থেকে করে এর সাওয়াবও তাকে দেওয়া যায়।.
.
.
৬) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরবানি করার সময় বলেছিলেন.
بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ.
.
"আল্লাহর নামে,হে আল্লাহ মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবার পরিজনের পক্ষে কবুল করেনিন।"[৭].
.
আর আলে মুহাম্মাদের মাঝে তাঁর জীবিত ও মৃত সকল আত্মীয়স্বজন শামিল। কাজেই কুরবানির জন্তুতে মৃতের ভাগ রেখে কিংবা মৃতের পক্ষেও আলাদা কুরবানি দিয়ে ইসালে সাওয়াব করা যায়।.
.
.
এভাবে যেকোনো নেক আমলের সাওয়াবই মৃতের উদ্দেশ্যে বকশে দেওয়া যায়। এর মাঝে কুর'আন খতম কিংবা সূরা বা আয়াতের সাওয়াব অন্যতম।.
.
.
ইসালে সাওয়াব অনুষ্ঠান:.
.
.
১) অনেকে ইসালে সাওয়াবের জন্য অনুষ্ঠান করেন এবং এজন্য নির্দিষ্ট দিন ধার্য করেন, যেমন ৪ঠা,চল্লিশা,বার্ষিকী ইত্যাদি। এটা বিদ'আত। নির্দিষ্ট কোনো দিন অনুসরণ না করেই ইসালে সাওয়াব করা উচিত।.
.
.
২) টাকার বিনিময়ে কুর'আন খতম দিয়ে ইসালে সাওয়াব করালে মৃত কোনো সাওয়াব পাবেনা। আর এভাবে বিনিময় নিয়ে কুর'আন খতম করা হারাম।.
.
.
৩) বিনিময় ছাড়াও পরিবারের লোকেরা সম্মিলিত ভাবে খতম করার যে রেওয়াজ হয়েছে সেটাও পরিত্যাজ্য। উচিত হচ্ছে যে যার স্থান থেকে যতটা পারে নেক আমল করে বা তিলাওয়াত করে যে যার মত সাওয়াব দিয়ে দেবে।[৮].
.

সর্বশেষ :.
.
.
কেউ মারা যাবার পর একটা সময় পরে সবাই তার কথা ভুলে যায়,এমনকি পরিবারের লোকদেরও বছরে নির্দিষ্ট দিনেই তার কথা মনে পড়ে। এই অভ্যাস পরিত্যাজ্য ;বরং মাঝেমধ্যেই মৃতের জন্য কিছু সাওয়াব রেসানি করা উচিত,কেননা তার আমলের দরজা তো বন্ধ হয়ে গেছে,সে অধীর অপেক্ষায় দুনিয়াবাসীর প্রেরিত সাওয়াবের পথ গোনে,তাই যথাসাধ্য তার জন্য সাওয়াব প্রেরণ করা উচিত।.
.
.
[১) সহিহুল মুসলিম,হা:১৬৩১
২) সুনানু ইবন মাজাহ,হা:৩৬৬০, ইমাম বুসিরীর রাহ. মতে সনদ সহিহ,রিজাল সিকাত-মাসাবিহুয যুজাজাহ:৪/৯৮
৩) সহিহুল বুখারি,হা:১৩৮৮
৪) সহিহুল মুসলিম,হা:১৬৩
৫) সহিহুন নাসাঈ,হা:৩৬৬৬
৬) সহিহুল মুসলিম,হা:১১৪৯
৭)সহিহুল মুসলিম,হা:১৯৬৭
৮) মাওলানা,হেমায়েত উদ্দীন,আহকামে যিন্দেগী,পৃ:৫৪৬]
Manzurul Karim
Industry is the key of Success.
No comments:
Post a Comment